হাইব্রিড-নাকি-নন-হাইব্রিড

হাইব্রিড নাকি নন-হাইব্রিড, কোন গাড়ি ভালো?

জীবনের প্রথম গাড়ি কিনতে অনেক উপদেশ শুনেছি
– প্রথম গাড়ি, অবশ্যই টয়োটা নিবেন।
– ভাই সেকেন্ড হ্যান্ড কিনেন, ১০০/১১০ অথবা পারলে করোল্লা ভাজি।
– কখনোই হোন্ডা না।
– হাইব্রিড গাড়ি তো কখনোই না, যদি কিনতেই চান হাইব্রিড , তাহলে একুয়া অথবা এক্সিও।
– বাংলাদেশের আবহাওয়া হাইব্রিড গাড়ির জন্য না, খুব বেশি হলে টয়োটা হাইব্রিড।

আচ্ছা বলেন তো, হাইব্রিড গাড়ি ভালো, নাকি নন-হাইব্রিড গাড়ি ভালো? আমার বড় চাচী বলেন, হাইব্রিড গাড়ি নাকি হাইব্রিড সবজির মতো, অল্প দামে ফলন বেশি, যেমন হাইব্রিড আলু!

কিন্তু কথায় বলে না ‘প্রথম দর্শনেই প্রেম’; জীবনে দ্বিতীয় বারের মতো প্রেমে পরলাম হোন্ডা গ্রেস এর বাহ্যিক সৌন্দর্য দেখে।

হ্যাঁ ভাই হ্যাঁ, জানি এটা একটা ডুয়েল ক্লাচ ট্রান্সমিশন গাড়ি, উল্টাপাল্টা চালালে ডুয়েল ক্লাচ এ সমস্যা হবে। তা-ও কিনলাম, কারণ আর কিছুই না, এর সৌন্দর্য এবং পয়সা উসুল গুনাবলী।

আমাদের (বাঙালি) সমস্যা, আমরা নতুন যে কোন কিছুই ভয় পাই, নিতে চাই না, কেউ সাহস নিয়ে কিনলেও তাকে ভয় দেখাই।

হ্যাঁ ভাই, আমি প্রথম কেনা (গত এপ্রিলে) গাড়ির গল্পই বলবো, যা একটি ডুয়েল ক্লাচ ট্রান্সমিশন হাইব্রিড গাড়ি, যার নাম হোন্ডা গ্রেস।

আরও পড়ুন: পুরোনো বা ব্যবহৃত গাড়ি কেনার সময় যে বিষয়গুলো মাথায় রাখতে হবে

কিনলাম, বলা উচিৎ পেলাম আমার দ্বিতীয় প্রেমিকা কে পেলাম! এবার পালা তার সত্যিকারের কার্যকারিতা পরীক্ষা করার! আবার ভেসে গেলাম কথার রাজ্যে –
– ভাই হাইব্রিড গাড়ি শুধু শহরের জন্য।
– খুব বেশি হলে সোজা হাইওয়ে ধরে চালান।
– পাহাড়ে যাবেন, আপনি পাগল।
হ্যাঁ ভাই, আমি পাগল। কক্সবাজার গেলে বলবেন, সোজা রাস্তা যাওয়াই যায়। আমার প্রেয়সী পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত, উঠব তাকে নিয়ে ১৮০০ ফিট উচ্চতায় মেঘের রাজ্য, সাজেক ভ্যালি তেই।

হঠাৎ পরিকল্পনা, হঠাৎ যাওয়া। রোযার ঈদের দুই দিন পর রওয়ানা দিলাম সাজেক ভ্যালির উদ্দেশ্যে। আমাদের পরকীয়া প্রেমের প্রথম হানিমুন, সাথে যদিও সঙ্গী সাথী আছেন।

এখানে বলে রাখি, প্রেয়সীর পরীক্ষায় কোন ছাড় নেই; ড্রাইভার সহ গাড়িতে পূর্ণবয়স্ক ৫ জন ও প্রয়োজনীয় লাগেজ।

আরও পড়ুন: বাংলাদেশে হাইব্রিড ব্যাটারি চেঞ্জ করা যাবে নাকি?

রাত ১:৩০ এ মহাখালীর ‘ক্লীন ফুয়েল’ থেকে তেল নিয়ে যাত্রা শুরু। কুমিল্লায় হাইওয়ে ইন রেস্টুরেন্টে পৌঁছালাম রাত ২:৪৫ এ। পেটে কিছু দিয়ে, একটু বিশ্রাম নিয়ে রাত ৩:৩০ এ বারইরহাট এর দিকে রওনা দিলাম। রাত ৪:১৫ তে বারইরহাট পৌঁছে নিলাম দ্বিতীয় যাত্রা বিরতি। এরপর শুরু বারইরহাট – খাগড়াছড়ি হাইওয়ে, যার বেশিরভাগই পাহাড়ী পথ, ভোরের আলো তাই দরকার ছিল। ৩০ মিনিট এর বিরতির পর রওয়ানা দিলাম খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে।

কিছু দূর যাওয়ার পর পাহাড়ী পথ শুরু। রাস্তা পুরোটাই ভালো, কিন্তু রোলার কোস্টার এর মতো এবং দুই দিকে গাছপালা দিয়ে ঢাকা, কিছু জায়গায় একপাশ পুরো পাহাড়ী ঢাল। এর সাথে রাস্তা এতটাই নির্জন যে সারা গায়ে একটা ভয় লাগা শিহরণ!

আপনি পাহাড়ী পথ ধরে যাচ্ছেন, আর সূর্য তার স্বমহিমায় ধীরে ধীরে আলো দিয়ে আপনার চারপাশে ভরিয়ে তুলছে, যেন আপনি একটা অনিন্দ্য সুন্দর স্বপ্ন দেখছেন, স্বপ্নের সেই অপার্থিব পরিবেশ সূর্যের আলোর সাথে গলে গলে আপনার চারপাশে পরছে, আর আপনাকে নিয়ে যাচ্ছে স্বপ্ন রাজ্যে।

স্বপ্নীল এই পরিবেশে ভোর কে উপভোগ করতে থামলাম এক নিঃসঙ্গ চা-দোকানে। সূর্যের আলো পাহাড়ের কোলের গাছপালা ভেদ করে আমার প্রেয়সীর গায়ে যখন পরছিল, এক অপূর্ব সৌন্দর্য্যের ছটায় আমার চোখ – মন – প্রাণ ভেসে যাচ্ছিল; ভাবছেন আমি বাড়িয়ে বলছি, ভাবতেই পারেন; আমি যে তখন ঘোর লাগা প্রেমিক। আমার এক সঙ্গী বলল, ‘ ভাই এক্সিও কিনলে কিন্তু এই ফিল পাইতেন না’। আমার পরীর জায়গায় একটা কচ্ছপের মতো অবয়ব কল্পনা করে আমার ঘোর টাই কেটে গেল।

চা খেয়ে রওয়ানা হলাম বাঘাইহাট এর দিকে, আমাদের যে সময় মতো আর্মি এসকর্ট ধরতে হবে। সকাল ৮:৩০ এ পৌঁছে গেলাম বাঘাইহাট। আর্মি চেকপোস্ট থেকে এন্ট্রি পাস নিয়ে, নাস্তা খেয়ে ঘড়ি তে ১০টা বাজার অপেক্ষায় রইলাম। হ্যাঁ আমরা একটা পাহাড়ী পথ পাড়ি দিয়েছি, কিন্তু শুনেছি বাঘাইহাট – সাজেক ভ্যালি পথটা নাকি অন্যরকম সুন্দর।

সকাল ১০টায় সাজেক ভ্যালির উদ্দেশ্যে আসা সব যান নিয়ে আর্মির গাড়ি রওয়ানা হল। চারদিকে সূর্যের আলোর বন্যা, গাড়ির এসি বন্ধ করে কাঁচ নামান সম্ভব ছিল না। তাই গাড়ির কাঁচের ভেতর দিয়েই উপভোগ করলাম অসাধারণ সব পাহাড়ী দৃশ্য। বাংলাদেশ এর অনেক এলাকায় গিয়েছি। সাজেক ভ্যালি যাবার রাস্তার দু’পাশের দৃশ্য আর উচ্চতায় ওঠার ভয় মিশ্রিত উত্তেজনা এর কোন তুলনা হয় না। অসাধারণ, অতি প্রাকৃত। বিশেষ করে শেষের ৩-৪ কিলোমিটার পথ এতোটাই খাড়া যে, আমি আমার প্রেয়সীকে নিয়েও ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। এই পথে গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতা আরও উত্তেজনায় ভরে দিবে আপনার সাথে চলতে থাকা চাঁদের গাড়ি গুলো এবং এসবের ছাদে বসা মানুষ গুলো। চাঁদের গাড়ির কোন কোনটি মনে হচ্ছিল যে সেটা আর উঠতে পারবেনা, বরং পিছিয়ে এসে আমার প্রেয়সীর মুখে থুবরে পড়বে। আর ছাদের মানুষ গুলোর জীবনের যেন কোন মায়াই নেই। প্রায় প্রতিটা চাঁদের গাড়ির পিছনে ২-৩ জন করে দাঁড়িয়ে আছে। আমার শুধু মনে হচ্ছিল, আল্লাহ পাক এদের কলিজা কি দিয়ে বানিয়েছেন!

দুপুর ১২:১৫ তে পৌঁছে গেলাম সাজেক ভ্যালি। বেরসিক প্রকৃতি, নামলো ঝুম বৃষ্টি। কোন রকমে রিসোর্ট এ ব্যাগ রেখে, গোসল করে, পেট পূজায় বের হলাম। প্রেমিকা কে বৃষ্টির কারণে কষ্ট দিতে হলো। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, সাজেক ভ্যালিতে ঘুরে বেড়ানোর জন্যে আপনার কোন যানবাহনের দরকার নেই। এতটাই ছোট যে, আপনি হেঁটে হেঁটে এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে যেতে পারেন এবং এটাই সবচেয়ে মজা।

পেট পূজা শেষে বিশ্রাম নেয়া উচিৎ, কিন্তু বেরসিক প্রকৃতি হুমকি দিচ্ছিল সূর্যাস্ত দেখতে না দেয়ার। ভাবলাম, বৃষ্টি যে হারে হচ্ছে দেখা যাবে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলবে। এখন রিসোর্ট এ ফিরলে হয়তো আর সাজেক ভ্যালি ঠিক মতো দেখাই হবে না। তাই খাবার রেস্টুরেন্ট থেকে সরাসরি হ্যালি প্যাডে। ঝিরঝির বৃষ্টি, চারপাশে ধোঁয়ার মতো মেঘ। যেদিকে তাকাই খালি মেঘ আর নীচে পাহাড়ী ঢাল। কাছে একটা ঝর্ণা আছে, বৃষ্টির কারণে আর যাওয়া হয়নি। কংলাক পাড়ায় ও একই কারণে যাওয়া হলো না।

আমার কাছে সাজেক ভ্যালি কে মনে হয়েছে বাংলাদেশের প্রথম ৫টি ট্যুরিস্ট স্পট এর ১টি। কি নেই এখানে?
– আপনি যদি কবি না ও হন, এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আপনাকে কাব্য গ্রন্থ রচনা করতে বাধ্য করবে।
– নির্দয় বাস্তবতা আপনার ভিতরের রোমান্টিক মানুষ টা কে মেরে ফেলেছে? আপনি সাজেক ভ্যালি যান, এর প্রকৃতি আপনাকে আবার রোমান্টিক বানিয়ে দিবে। দ্বিতীয় – তৃতীয় হানিমুন এর জন্য তো সাজেক ভ্যালি বাংলাদেশের মাঝে সেরা।
– আপনারা তরুণ প্রজন্মের দল? অ্যাডভেঞ্চার দরকার? অনেক খানি হইচই দরকার? চলে যান‌ সাজেক ভ্যালি।
– আপনার একাকী সময় কাটানোর দরকার? নিজেকে নিয়ে ভাবা দরকার? উত্তর : সাজেক ভ্যালি চলে যান। দিন শেষে আপনি আপনার সকল ক্লান্তি – গ্লানি দূর করে সম্পূর্ণ তাজা উদ্যমী মনোভাব নিয়ে শহুরে বাস্তবতায় ফিরে আসতে পারবেন।

দিন তো কাটালাম, এবার রাত কাটানোর পালা। রাতের খাবার দিয়েই রাত উপভোগ শুরু। আদিবাসী খাবার ব্যাম্বু চিকেন আর শহরের পরিচিত চিকেন বারবিকিউ এর সাথে পরোটা, রাতের পেট পূজা এর থেকে ভালো আর হতেই পারে না। স্থানীয় কফি আর গভীর রাত পর্যন্ত ভ্যালির সুনসান নীরবতায় আড্ডা, জীবন সত্যই বড়ই সুন্দর।

সাজেক ভ্যালি এর রাত, এর নীরবতা সবই অদ্ভুত। সবচেয়ে অদ্ভুত এর সূর্যোদয়। সাজেক ভ্যালির সূর্যোদয় দেখে আপনার মনে হবে আপনি স্বর্গীয় কিছু দেখছেন। যদি কখনো সাজেক ভ্যালি যান, সূর্যোদয় দেখতে ভুলবেন না।

এবার বিদায় জানাবার পালা। প্রেয়সীকে নিয়ে পরকীয়া শেষ, এবার শহুরে বাস্তবতায় ফেরার পালা। সকালের নাস্তা সেরে ১০টার দিকে আর্মি এসকর্ট এর সাথে আবার সেই অনিন্দ্য সুন্দর পাহাড়ী রোলার কোস্টার এ চড়ে বাঘাইহাট এর উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পরলাম। এলাকার আদিবাসীরা তাদের বাড়িতে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে বিদায় জানালো আমাদের।

সাজেক ভ্যালি থেকে বারইরহাট পর্যন্ত আসার পথে ৩টা স্পট পরবে – হাজাছড়া ঝর্ণা, আলুটিলা গুহা ও রিসাং ঝর্ণা। হাতে সময় থাকলে অবশ্যই ঘুরে আসবেন, আমরাও দেখে এসেছি। আলুটিলা গুহা নিয়ে যে মিথ আছে তার সত্যতা পাইনি, কিন্তু গুহায় প্রবেশ এর জায়গায় দাঁড়িয়ে পুরো খাগড়াছড়ি শহর দেখা টা খুবই উপভোগ্য।

ফেরার বর্ণনা দিয়ে গল্পটা আর বড় করবো না।

কিছু দরকারি তথ্য ::

– উত্তরা থেকে সাজেক ভ্যালি মোট ৬৯০ কি মি (যাওয়া – আসা)।
– উত্তরা থেকে ফেনী পেরিয়ে বারৈরহাট ১৯০ কি মি। (চট্টগ্রাম হাইওয়ে)
– বারৈরহাট থেকে বাঘাইহাট ১২০ কি মি। (খাগড়াছড়ি হাইওয়ে, মূলতঃ পাহাড়ী পথ)
– বাঘাইহাট থেকে সাজেক ভ্যালি ৩৫ কি মি। (পাহাড়ী পথ)
– পুরো ট্রিপ মাইলেজ ছিল ১৮ কি মি/লি।
– ফুয়েল ট্যাংক পুরো ভর্তি করে তেল নিয়ে রওয়ানা দিয়েছি, ফিরে এসে পরের দিন সকালে ৩৮.৩৭ লি তেল নেয়া হয়েছে।
– উল্লেখ্য যে খাগড়াছড়ি হাইওয়ে তে ১৭-১৯/লি এবং বাঘাইহাট এর পর থেকে ৫-৭/লি মাইলেজ পাওয়া যায়। চট্টগ্রাম হাইওয়ে তে গড়ে ২৭-২৯/লি।
– ড্রাইভার সহ মোট যাত্রী ৫ জন। সাথে প্রয়োজন মত ব্যাগ।
– টায়ার প্রেসার ৪০-৪০।
– গাড়িতে বাটি লাগানো নাই।
– সাজেক ভ্যালি – বাঘাইহাট দিনে ২ বার আর্মি এসকর্ট যাওয়া আসা করে, সকাল ১০টা ও দুপুর ২টা; আর্মি এসকর্ট ছাড়া এ পথে চলাচল
– সাজেক ভ্যালি আর্মি নিয়ন্ত্রিত এলাকা, গাড়ি রাস্তায় রাখলেও কোনো সমস্যা নেই, শুধু কাভার সাথে নিয়ে যাবেন।
– রিসোর্ট গুলোর ভাড়া ২৫০০-৩৫০০ এর মাঝে, ৪জন এক রুমে থাকতে পারবেন। আর্মি রিসোর্ট গুলো ছাড়া।
– খাবার এর মান ভালো এবং দাম হাতের নাগালে।
– ব্যাম্বু চিকেন খেতে খানিকটা মিষ্টি লাগবে।
– রাতের খাবার দুপুরেই অর্ডার করে আসতে হয়।

কোন সমস্যায় পড়েছি? না, গাড়ি নিয়ে কোন সমস্যা দূরে থাক, টায়ার লিক ও হয় নাই।

পরিশেষে, আমার ভালোবাসার গ্রেস এর সত্যিকারের পরীক্ষা কিন্তু আমি নিয়ে নিলাম। আপনার গ্রেস এর শক্তি ও দক্ষতা যদি দেখতে চান, পাহাড়ী এলাকায় ঘুরে আসুন। এই ট্রিপ প ওর প্রতি আমার ভালোবাসা বাডিয়েছে

Written by: Akik Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *